ছেলে সাদাতের নাম এখন বিশ্বের ঘরে ঘরে

ছেলে সাদাতের নাম এখন বিশ্বের ঘরে ঘরে

 তরুণ সমাজ সংস্কারক হিসেবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতে নিলো মাগুরার আলোকদিয়া গ্রামের মোল্যাবাড়ির কিশোর সাদাত রহমান। সাইবার বুলিং ও সাইবার অপরাধ থেকে শিশুদের রক্ষায় কাজ করে শিশুদের নোবেল খ্যাত পুরস্কারটি জয় করার পর সারাবিশ্বের ঘরে ঘরে এখন সাদাতের ছবি শোভা পাচ্ছে।

জেলার সদর উপজেলার আলোকদিয়া গ্রামের মোল্যা বাড়ির ১৭ বছর বয়সি এই কিশোরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বাংলাদেশের পতাকা উড়লো গৌরবের সঙ্গে। সাদাত ওই গ্রামের সাখাওয়াত হোসেন ও মলিনা খাতুন দম্পতির একমাত্র সন্তান।

বাবার ডাক বিভাগে চাকরির সুবাদে সাদাত গত তিন বছর যাবত পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছে নড়াইলে। সে বর্তমানে নড়াইল আবদুল হাই সিটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থি।

১৩ নভেম্বর শুক্রবার নেদারল্যান্ডসের হেগে আয়েজিত এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাকে পুরস্কৃত করা হয়। করোনা প্রাদূর্ভাবের কারণে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করা হয় অনলাইনে। আফগানিস্তানের মালালা ইউসুফজাই ২০১৩ সনে পুরস্কারটি জিতে সারাবিশ্বে ব্যাপক হৈ-চৈ ফেলে দেন। বিশ্বনন্দিত সেই মালালা ইউসুফজাই অনলাইনে যুক্ত হয়ে সাদাতের হাতে গৌরবময় এই পুরস্কারটি তুলে দেন।

সাদাতের সঙ্গে চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাওয়া অন্য দুজন হলো মেক্সিকোর ইভান্না ওরতেজা সেরেট ও আয়ারল্যান্ডের সিয়েনা ক্যাস্টেলন। ওই পুরস্কারের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু গত ২৯ অক্টোবর ওই তিন প্রতিযোগির নাম ঘোষণা করেন।

‘কিডস-রাইটস’ নামের একটি সংগঠন ২০০৫ সালে রোমে অনুষ্ঠিত নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়িদের এক শীর্ষ সম্মেলন থেকে এই পুরস্কার চালু করে। শিশুদের অধিকার উন্নয়ন ও নিরাপত্তায় অসাধারণ অবদানের জন্য প্রতিবছর তারা আন্তর্জাতিক এই শিশু শান্তি পুরস্কারটি দিয়ে আসছে। যেখানে ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সিরাই ওই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য।

পড়াশোনার পাশাপাশি সাদাত রহমান ও তার কয়েকজন বন্ধুদের নিয়ে সাইবার বুলিং ও সাইবার ক্রাইম থেকে শিশু-কিশোর-কিশোরিদের রক্ষায় নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যেসব কার্যক্রমের কারণে কিডস রাইটস তাদের ওয়েবসাইটে সাদাত রহমানকে একজন তরুণ চেঞ্জমেকার ও সমাজসংস্কারক হিসেবে উল্লেখ করেছে।

সাদাতের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে পিরোজপুরের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থি এক কিশোরির আত্মহত্যার ঘটনা তার মনে দাগ কেটে দেয়। মেয়েটি কাউকে কিছু না বলে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এ বিষয়টিকে মাথায় রেখে সে কাজে নেমে পড়ে। বন্ধুদের সহায়তায় তৈরি করে ‘নড়াইল ভলেন্টিয়ারস’ নামের একটি সামাজিক সংগঠন। যার মাধ্যমে তারা সাইবার বুলিং এবং সাইবার অপরাধ থেকে শিশুদের রক্ষায় নানা প্রচারণা চালাতে থাকে।

এসব প্রচারণামূলক কাজের জন্যে সাদাত ‘সাইবার টিনস’ নামে একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করে। এই অ্যাপের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরিরা জানতে পারে কীভাবে ইন্টারনেট দুনিয়ায় নিজেদের সুরক্ষিত রাখা যায়। আর এই অ্যাপের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৬০টির বেশি অভিযোগ মিমাংসা করা হয়েছে এবং ৪ জন সাইবার অপরাধির শাস্তিও নিশ্চিত হয়েছে।

সাদাত রহমান বলেন, বর্তমানে ‘সেফ ইন্টারনেট-সেফ টিনএজার’ নামের একটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। এছাড়া সাইবার অপরাধ এবং নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেমিনার, কর্মশালার মাধ্যমে কিশোর-কিশোরিদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছি। আর পুরস্কারের সঙ্গে হিসেবে পাওয়া ১ লাখ ইউরো মোবাইল অ্যাপটির উন্নয়নে ব্যয় করতে চাই।

ছেলের কৃতিত্বে খুশি বাবা সাখাওয়াত হোসেন, মা মলিনা খাতুনসহ পরিবারের অন্যান্যরাও। সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সাদাত আমাদের একমাত্র ছেলে। লেখাপড়া ঠিকই করে। কিন্তু পারিপাশির্^ক অন্যান্য বিষয়ের প্রতি তার মনোযোগ কম নয়। ছেলের ইচ্ছের বিষয়ে কখনোই আমরা বাধা দিইনি। তবে চাই সে সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সে লেখাপড়াটাও চালিয়ে যাক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *