রবিবার, ১৯ অগাস্ট ২০১৮, ০৯:২৪ পূর্বাহ্ন

ভরা মওসুমে ইলিশের আকাল : মহাজনের ঋনের ফাঁদে আটকে থাকা জেলেরা হতাশ

ভরা মওসুমে ইলিশের আকাল : মহাজনের ঋনের ফাঁদে আটকে থাকা জেলেরা হতাশ

এইচ,এম,হুমায়ুন কবির, কলাপাড়া (পটুয়াখালী) :
কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে ইলিশের ভরা মওসুম শুরু হলেও জেলেদের জালে ধরা পড়ছে না পর্যাপ্ত ইলিশ। জেলে পরিবারে চলছে চরম দুর্দিন ও মহাজনের ঋনের ফাঁদে-আটকে-থাকা-জেলেরা-হতাশ।
ইলিশ মওসুম শুরু হলে দু-একটি ইলিশ ধরা পড়লেও চড়া দামে কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। যে কারণে নি¤œবিত্ত ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে ইলিশের দাম। ইলিশের প্রজনন ও বংশবিস্তার নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে সমুদ্র উপকূলীয় নদ-নদীতে কমছে ইলিশের পরিমাণ এমনটিই ধারণা স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের, যা পড়ছে তা দিয়ে খরচের টাকাই উঠছে না জেলেদের। মৎস্যবন্দর মহিপুর –আলীপুর-কলাপাড়া বাজারগুলোতে দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে রুপালি ইলিশ। প্রয়োজনের চেয়ে স্বল্প মাত্রায় সরবরাহের কারণে ইলিশের বাজার চড়া হয়ে উঠছে।
ভোজন রসিক বাঙালির কাছে মাছের রাজা ইলিশ। স্বাদে ও রূপে অনন্য এ মাছ ক্রমেই বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় দণিাঞ্চলের নদ-নদী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। তাই রসনার তৃপ্তি মেটাতে পারছেন না বাঙালি। ভরা মওসুমেও দণিাঞ্চলের নদ-নদীতে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে না ইলিশ। জাটকা নিধন, জলবায়ু পরিবর্তন ও অনাবৃষ্টির কারণে নদীতে মাছের আকাল দেখা দিয়েছে। ফলে আজ জেলেদের জীবনে দুর্দিন নেমে এসেছে। অপর দিকে জেলেরা সাগরে নামতেই জলদস্যুদের অপহরণের শিকার হচ্ছেন। প্রতি বছর বঙ্গোপসাগরে একের পর এক জলদস্যু হামলার শিকার হয়ে শত শত জেলে অসহায় নিঃস্ব হয়ে গেছে। অনেক জেলে ইলিশ ধরা বন্ধ করে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
মৎস্যবন্দর মহিপুর –Ñ আলীপুর অনেক ট্রলার মালিক জানান, তারা প্রত্যেকে লাখ টাকার উপরে দাদন নিয়ে ট্রলার সাগরে পাঠিয়েছেন ইলিশ শিকারের জন্য। কিন্তু ভরা মওসুম থাকলেও তারা যে পরিমাণ আশা করছিলেন সে পরিমাণ মাছ জালে ধরা পড়ছে না। বিশেষ করে বর্ষা মওসুমে ইলিশ গভীর নদী থেকে মিঠা পানিতে আসে। আর তখনই জালে ধরা পড়ে প্রচুর ইলিশ। এখন ইলিশের ভরা মওসুম হলেও ইলিশ ধরা পড়ছে না সাগরে। দাদনের এত টাকা পরিশোধ করা তাদের জন্য অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ছে। বেসরকারি সংস্থা কোডেক এর এক জরিপে জানাগেছে, সমদ্র উপকুলীয় কলাপাড়ায় ৪০টি জেলে গ্রাম , ২ হাজার ৫৩৩ টি জেলে পরিবারে ২৭ হাজার ৮৪০ জন সদস্য রয়েছে।
øষাটর্ধ্ব জেলে জাহাঙ্গির হাওলাদার ৮ সদস্যের পরিবার। থাকেন রাবনাবাঁধ নদীতীরবর্তী বেড়িবাঁধের পাড়ে। এ পরিবারটির জীবন চলে রাবনাবাঁধ নদীতে মাছ ধরে। আর এ মাছ ধরার কাজে জেলে জাহাঙ্গির হাওলাদার মহাজন, ব্যাংক আর বিভিন্ন এনজিওর ঋণের জালে আটকা পড়েছেন। তবু ইলিশ মাছ ধরে কোনো মতে চলছিল এ পরিবারটির ভরণ-পোষণ। হঠাৎ করে রাবনাবাঁধ নদীতে মাছের আকাল দেখা দিয়েছে। সারা দিন জেলেরা নদীতে জাল ফেলে ইলিশ না পেয়ে শূন্য হাতে ফিরছেন।
শুধু জেলে জাহাঙ্গির হাওলাদার নন, রাবনা বাঁধ নদীর ও বাবলাতলা ঢোস.কলাপাড়া বিভিন্ন নদী মোহনাসহ কয়েক হাজার জেলে পরিবারে এমন মাছের আকালে জেলে পরিবারগুলোতে চলছে অভাব।
কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া জেলেপল্লীর জেলে জাহাঙ্গির হাওলাদার বলেন, ‘ত্রিশ বছর রাবনাবাঁধ গাঙ্গে মাছ ধইরা খাই, এবার গাঙ্গে আকাল পড়ছে। হারাদিন জাল পাইত্যা কোনো ইলিশ পাইতেছি না। যেদিন মাছ পাই হেদিন দুইডা জোডে আর যে দিন পাই না হে দিন পোলা-মাইয়া লইয়া অর্ধাহারে অনাহারে থাহি।’ জাহাঙ্গির হাওলাদার জানান, ভরা মওসুমের দেড় মাস পার হয়ে গেলেও রাবনাবাঁধ নদীতে ইলিশের দেখা মিলছে না। তাই জেলেদের ঘরে ঘরে এখন অভাব আর অভাব।
সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা দেখা গেছে, মৎস্যবন্দর কলাপাড়া ও মহিপুর -আলীপুর বাজারে আগের মতো ইলিশ উঠছে না জেলেদের জালে। ফলে শূন্যহাতে প্রতিদিনই অনেক জেলে ডাঙ্গায় ফিরে আসছেন। ভরা বর্ষা মওসুমেও জেলেদের জালে ইলিশ ধরা না পড়ায় দেনার দায়ে চরম দিশেহারা তারা। অনাহারে, অর্ধাহারে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের। কষ্টে জীবন চলছে জেলার জেলে ও মাছ ব্যবসার সাথে জড়িত পরিবারগুলোর। মহাজনের দায়দেনা সত্ত্বেও সংসার চালাতে ফের একাধিক এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কিস্তি শোধ করতে পারছেন না তারা। ফলে দেনার দায়ে অনেক জেলে এখন এলাকাছাড়া। ঘাটে শত শত নৌকা ও ট্রলার বাঁধা। নদীতে মাছ না থাকায় জেলেরা এখন বেকার হয়ে পড়ে বাড়িতে অলস সময় কাটাচ্ছেন। আড়ৎ মালিকেরা জানান, আড়তে ইলিশ না এলে কত দিন এ পেশা ধরে রাখতে পারবেন জানেন না। পরিবার-পরিজনের মুখে দুই মুঠো অন্ন জোগাতে এখন বাধ্য হয়ে নতুন পেশা খুঁজছেন। মহিপুর মুদি দোকানদার জাকির জানান,জেলে বিভিন্ন দোকান থেকে এতোদিন ধারদেনা করে চললে ও এখন দোকানিরা জেলেদের বাকি দিচ্ছেনা। দোকানদাররাও পড়েছেন মহাবিপদে। তারা জেলেদের বাকি দিতে মালমাল শুন্য হয়ে পড়েছে দোকান গুলো। এখন আর বাকিতে মালামাল দেয়ার সাধ্য তাদের নেই। একটি ট্রলারকে জ্বালানি তৈল ,রসদসহ অন্যান্য সব মিলিয়ে প্রতিট্রিপে দোকান থেকে খরচ দিতে হয় ৩৫ হাজার ৪০ হাজর টাকা।
কলাপাড়া বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে দেখো যায়, বাজারে দু-একটা ইলিশ উঠলেও তার দাম সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়মতার বাইরে। এখানে প্রতি কেজি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায়। বাজারে স্বল্প পরিমাণ ইলিশ ওঠায় জেলে, আড়তদার ও শ্রমিকসহ অনেকেই বসে বসে পুঁজির টাকা খরচ করছেন। অপর দিকে ইলিশনির্ভর উপকূলীয় এলাকার মানুষের চোখেমুখে এখন অভাবের ছাপ।
কলাপাড়া মৎস্য কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে সাগরে ইলিশ প্রবেশ করছে ও বর্ষা মওসুম শুরু হয়েছে। আষাঢ়ের ঘনবৃষ্টি শুরু হলে উপকূলীয় নদনদীতে ইলিশের আনাগোনা বাড়তে পারে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




  • ডিজাইনঃবেসিক নিউস২৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com