আমরা সত্য প্রকাশে আপোষহীন

মশার কামড়ে নতুন রোগে ভুগছে গরু

1 min read

মশার কামড়ে নতুন রোগে ভুগছে গরু

ঝিনাইদহে মশার কামড়ে ‘লামথি স্কিন ডিজিজ’ নামক একটি নতুন ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে গরু। জেলার সব উপজেলায় এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এতে আক্রান্ত গরুর প্রথমে পা ফুলে যায়। এরপর জ্বর হয়ে ২/৩ দিনের মধ্যে গোটা শরীরে বসন্তের মত ফোসকা পড়ে। যা পরবর্তীতে ঘায়ে পরিণত হচ্ছে।

স্থানীয় পশু চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ‘লামথি স্কিন ডিজিজ’ একটি নতুন ভাইরাস জনিত রোগ। আগে কখনো দেখা যায়নি। তবে ৯০ এর দশকে আফ্রিকাতে এই রোগের প্রাদুর্ভাব ছিল। মূলত মশার কামড় থেকে এ রোগ ছড়ায়। এবার বাংলাদেশের অনেক স্থানেই এই রোগ দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় তারা গরুকে মশারির মধ্যে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।

নওগাঁ প্রাণিসম্পদ অফিস ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার ছয় উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে এ রোগ। সরেজমিনে কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কৃষকদের হালের বলদ, দুধের গাভী, সদ্যজাত বাছুর- সব গরুই এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্ত গরুগুলোর পা ফুলে গেছে, সারা শরীরে বসন্তের মত গুটিগুটি ফোসকা হয়েছে। পায়ের খুরায় ক্ষত দেখা দিচ্ছে। আক্রান্ত গরুগুলো স্বাভাবিক চলাফেরা করছে না। সারাক্ষণ চুপচাপ থাকছে। খাওয়ারও কোনো আগ্রহ নেই।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের লিখন জানান, তার গোয়ালের মোট ৪টি গরুর পা ফুলে গায়ে ফোসকা বের হয়েছে। এরমধ্যে একটি বড় বলদের অবস্থা খুবই খারাপ। পায়ের ফোলা স্থানে ক্ষত হয়ে পচন ধরে গর্ত হয়ে গেছে। এ জন্য প্রায় পাঁচ হাজার টাকা খরচ করেছেন, কিন্ত এখনও সুস্থ করতে পারেননি।

মহেশপুর উপজেলার ভৈরবা গ্রামের উজ্জল হোসেন জানান, কয়েকদিন আগে তার দু’টি গরুর প্রচণ্ড জ্বর হয়। এর একদিন পরেই সারা শরীরে চাক চাক হয়ে ফুলে উঠে। স্থানীয় পশুচিকিৎসকদের দিয়ে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে, এখন অনেকটা ভালোর দিকে।

কোটচাঁদপুর উপজেলার তালিয়ান গ্রামের নারায়ণ বিশ্বাস জানান, তার হালের তিনটি বড় বলদের অবস্থা বেশ খারাপ। স্থানীয় চিকিৎসক দেখিয়ে ওষুধ খাওয়াচ্ছেন, কিন্ত সুস্থ হচ্ছে না।

কালীগঞ্জের পারখালকুলা গ্রামের কৃষাণী মোমেনা বেগম জানান, তিনি বাড়িতে একটি গাভী পালন করছেন। আট মাস আগে একটি ষাঁড় বাছুর জন্ম দিয়েছিল। তিনদিন আগে গাভীটির পা ফুলে জ্বর আসে এবং সারা শরীরে বসন্তের মত গুটি গুটি ফোসকা বের হয়। এখন কোনো কিছুই খাচ্ছে না। ফলে বাছুরটি ক্রমেই রোগাক্রান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

হরিণাকুন্ড উপজেলার সুফিয়া বেগম জানায়, তার দুটি দেশি জাতের গরু আছে। এরমধ্যে একটির পেটের ওপরে গোল করে ফোসকা ওঠে গর্ত হয়ে পচন ধরেছে। যা দেখলে ভয় লাগছে। অনেক টাকার ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে, কিন্ত ভালো হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।

শৈলকুপার কৃষক মনিরুল ইসলাম জানান, তার একটি গরুর একই অবস্থা। তিনি আরও বলেন, প্রায় প্রতিটি কৃষক পরিবারেই গরু আছে। গবাদিপশু তারা নিজেদের সন্তানের মত করেই লালন পালন করেন। এগুলো অসুস্থ হলে তারা খুব ভেঙে পড়েন। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের সহযোগিতা আশা করেন।

এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আতিকুজ্জামান জানান, দেশের অনেক স্থানে এই রোগ দেখা দিয়েছে। লামথি স্কিন ডিজিজ (lumphy skin diseases) বলে এক ধরনের ভাইরাস এটা। আগে এই রোগ দেখা যায়নি। তিনি বলেন, এই রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটা কম। তবে এতে গরুর অনেক ক্ষতি হয়, রোগাক্রান্ত হয়ে যায়। তাছাড়া গরুর মালিকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। তিনি বলেন এই রোগ দেখা দিলে অন্য গরু থেকে আক্রান্ত গরুকে আলাদা করে রাখতে হবে। মশার মাধ্যমে ছড়ানোর কারণে অবশ্যই রোগাক্রান্ত গরুকে মশারির মধ্যে রাখতে হবে। সুস্থ গরুও মশারির মধ্যে রাখলে আক্রান্ত হবার আশঙ্কা কম থাকে।

জেলার হরিণাকুন্ডু ও শৈলকুপা উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. সুব্রত কুমার ব্যানার্জী জানান, এ রোগে কৃষকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। আক্রান্ত গরুর জ্বর হলে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খাওয়াতে হবে। আর এভাবে ৪-৫ দিন অতিবাহিত হলে এবং ক্ষত জায়গা খুব খারাপ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। দু’উপজেলার দ্বায়িত্বে থাকা এই প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, এ রোগটি ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যাচ্ছে। তবে গরুগুলো খুব দুর্বল হয়ে পড়ছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাফিজুর রহমান জানান, ভাইরাস জনিত এ রোগটি সারা জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। রোগটি এবারই প্রথম দেখা দিয়েছে। রোগের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট হাতে না আসা পর্যন্ত এ সম্পর্কে সঠিকভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে প্রাথমিকভাবে গরুর পক্স হিসেবে চিহ্নিত করে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *