রবিবার, ২৪ Jun ২০১৮, ০২:৫১ অপরাহ্ন

দলের শীর্ষ নেতাদের না জানিয়ে ভারতে প্রতিনিধি পাঠান তারেক

দলের শীর্ষ নেতাদের না জানিয়ে ভারতে প্রতিনিধি পাঠান তারেক

নিউজ ডেস্ক :
বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি ভারত সফর করেছেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিনিধি দলের এই ভারত সফর বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও সফরের বিষয়টি জানতেন না দলটির শীর্ষ নেতারা।
দলীয় সূত্রমতে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবীরকে ভারত সফরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত ছিল তারেক রহমানের একার।
লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তার রাজনৈতিক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীরকে লন্ডন থেকে দিল্লিতে পাঠান। আর ঢাকা থেকে দিল্লি যাওয়ার নির্দেশ দেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও আব্দুল আউয়াল মিন্টুকে। দিল্লি সফর শেষে এরই মধ্যে লন্ডনে ফিরে গেছেন হুমায়ুন কবীর।
এই সফর সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘দলের পক্ষ থেকে কেউ ভারত সফরে গেছেন বলে আমি জানতাম না। পরে পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি।’
দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও বলেন, “বিএনপির প্রতিনিধি দলের ভারত সফর সম্পর্কে আমি কিছু জানতাম না। আমি শুধু ‘দ্যা হিন্দু’তে দেখেছি। যাওয়ার আগে-পরে এ বিষয় নিয়ে দলীয় ফোরামে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না— সেটাও আমি জানি না।”
সফরকালে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবীর ভারতের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক দ্য হিন্দুকে বলেছেন, “পেছনে না তাকিয়ে আমাদের সামনের দিকে তাকানো উচিত। গত শতকের ৮০ ও ৯০-এর দশকের রাজনীতি এখন বাতিল হয়ে গেছে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে যে খারাপ সম্পর্ক ছিল, তা ‘ভুল ও বোকামিপূর্ণ’ নীতির ফসল। তারেক রহমান চান, আমরা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলি।”
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, হুমায়ুন কবীরের এই বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়েছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। তারা বলছেন, ৮০ ও ৯০ দশকে বিএনপি’র বারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার নেপথ্যে ছিল ‘ভারতবিরোধী’ অবস্থান। সেটাকে সরাসরি ‘ভুল ও বোকামিপূর্ণ’ বলে হুমায়ুন কবীরের মন্তব্য এখতিয়ার বহির্ভূত।
হুমায়ুন কবীরের বক্তব্য সম্পর্কে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘তাকে আমি চিনি না। কে কোথায় কী বললো, তার ব্যাখ্যা আমি দেবো না। ওই সফরে তো আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ছিলেন। আপনি তার সঙ্গে কথা বলুন।’
অবশ্য বিএনপির কোনো কোনো নেতা বলছেন, হুমায়ুন কবীর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজন। সুতরাং তার বক্তব্যকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। তার বক্তব্য প্রকারান্তরে তারেক রহমানেরই বক্তব্য। আর তারেক রহমানের অবস্থানই বিএনপির অবস্থান।
এ প্রসঙ্গে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘তিনি কী পরিপ্রেক্ষিতে কী বলেছেন! পত্র-পত্রিকায় অনেক কথা আসে। আমরা খতিয়ে না দেখা পর্যন্ত কিছু বলতে পারব না।’
বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা বলেন, মোটা দাগে আমরা যেটা বলতে পারি— ভারত অভ্যন্তরীণভাবে গণতান্ত্রিক একটি দেশ এবং নিঃসন্দেহে এই অঞ্চলের বৃহত্তর গণতন্ত্রের দেশ। সেখানে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকারের পালাবদল হয়। তাদের প্রতি আমাদের যথেষ্ট সম্মান-শ্রদ্ধাবোধ আছে। সে কারণেই আমাদের বিশ্বাস, বাংলাদেশ প্রশ্নে দলভিত্তিক নীতিতে তারা অনড় থাকবেন না। তাদের অবস্থান বদলাবে।
বিএনপির এই নেতা আরো বলেন, ভারতের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল বিজেপি ও কংগ্রেসের কাছে দলীয় অবস্থান স্পষ্ট করেছে বিএনপি। যেসব বিষয়ে তাদের উদ্বেগের বিষয় ছিল, সেগুলো দূর করেছে। কিছু আশ্বাসও দিয়েছে। দেশটির থিংকট্যাংক হিসেবে পরিচিত কয়েকটি সংগঠনের কাছেও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোও চায় বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হোক।
উল্লেখ্য, ভারত-বিরোধিতাকে পুঁজি করেই বিএনপির প্রতিষ্ঠা। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দলটির রাজনীতির একটি বড় অনুষঙ্গ ভারত-বিরোধিতা। দলটির প্রতিদিনের রাজনৈতিক ভাষণ-বক্তৃতা-বিবৃতিতেও এ বিরোধিতা স্পষ্ট। জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দলটির অন্যতম ভিত্তিই ছিল ভারতবিরোধী অবস্থান।
আওয়ামী লীগ সরকারে সঙ্গে ভারতের যেকোনো কর্মকাণ্ডকে বিএনপি সন্দেহ করে আসছে। মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিকে ‘দাসত্বের চুক্তি’ বলে সমালোচনা আসছে দলটি। ১৯৯৭ সালে এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত একে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বলে সমালোচনা করে গেছে তারা। ফারাক্কার পানিবণ্টন চুক্তি, ১৯৯৭ সালে সই হওয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিরও তীব্র বিরোধিতা করেছে বিএনপি। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর খোদ খালেদা জিয়া বলেছিলেন, পার্বত্য চুক্তি হলে ফেনী পর্যন্ত ভারতের অংশ হয়ে যাবে।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল, আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে দেশ ভারত হয়ে যাবে। বিএনপির ভারতবিরোধী অবস্থান আরো স্পষ্ট হয় যখন ২০১৩ সালের মার্চে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশে এলে নির্ধারিত সৌজন্য সাক্ষাতে যাননি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
এ ছাড়া, বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল ১০ ট্রাক অস্ত্রের একটি চালান ধরা পড়ে। রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজারের (সিইউএফএল) জেটিঘাটে খালাস করার সময় চালানটি আটক করে টহল পুলিশ। অস্ত্রের চালানটি উলফার জন্য যাচ্ছিল। এ নিয়ে ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি দু’টি মামলার রায় দেন আদালত। এর একটিতে সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়া ও দু’টি গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ১৪ জনের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক যখন এমন, তখন খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলের শীর্ষ নেতাদের অন্ধকারে রেখে আইনের চোখে ‘পালাতক’ তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে খুব একটা সফল হবেন না। বরং দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তার দূরত্ব আরো বাড়বে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন প্রবীণ সদস্য বলেন, প্রতিনিধি দলের ভারত সফর দলীয় ফোরামে আলোচনার ভিত্তিতে হয়নি। তিনি (তারেক রহমান) যদি সবাইকে এড়িয়ে একা কিছু করতে চান, করুক। কিন্তু তাতে তিনি সফল হবেন বলে মনে হয় না।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




  • ডিজাইনঃবেসিক নিউস২৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com