বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম:
ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বিভ্রান্তি: শরিয়াহ, অর্থনীতি ও বৈশ্বিক বাস্তবতা কী বলে? মহম্মদপুরে সিরাতুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত মহম্মদপুরে সিরাতুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত মহম্মদপুরে সিরাতুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত মাগুরায়, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬ ঘটিকায় লেংটা বাবার আশ্রমে শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে যাত্রাপালা শ্রীপুরে পল্লিবিদ্যুতের চরম অবহেলায় দিনমজুরের করুণ মৃত্যু: ২ কর্মী বরখাস্ত মাগুরায় দেশব্যাপী ফলজ ও ভেষজ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের হস্তক্ষেপে উত্তপ্ত মহম্মদপুর: সংঘাত এড়াল বিএনপির দুই পক্ষ মাগুরায় শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বার অভিযোগ: বিতর্কিত শিক্ষক লাপাত্তা, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি শালিখা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ: তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে ধোঁয়াশা, নিষ্ক্রিয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বিভ্রান্তি: শরিয়াহ, অর্থনীতি ও বৈশ্বিক বাস্তবতা কী বলে?

Reporter Name

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বিভ্রান্তি: শরিয়াহ, অর্থনীতি ও বৈশ্বিক বাস্তবতা কী বলে

আব্দুল্লাহ আল মামুন /আধুনিক ইসলামী অর্থনীতির সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি হলো ইসলামী ব্যাংকিং। বিশেষত বাংলাদেশে প্রায়ই একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়—ইসলামী ব্যাংক কি সত্যিই ইসলামী, নাকি এটি প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থারই নতুন নাম?

প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইসলামে সুদ (রিবা) কেবল একটি আর্থিক অনিয়ম নয়; বরং এটি কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট নির্দেশনায় নিষিদ্ধ একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। আল্লাহ তাআলা বলেন—

«﴿وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا﴾

“আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।”

(সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৫)»

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন—

«﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ﴾

“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকো।”

(সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৮)»

রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলকে সমভাবে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন—

«لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُؤْكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ

“রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদ গ্রহণকারী, সুদ প্রদানকারী, সুদের লেখক এবং সাক্ষীদ্বয়কে অভিশাপ দিয়েছেন এবং বলেছেন—তারা সকলেই সমান।”

(সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)»

এই সুদবিরোধী অবস্থান থেকেই মুসলিম অর্থনীতিবিদ ও ফকিহগণ বিংশ শতাব্দীতে সুদমুক্ত আর্থিক ব্যবস্থার বাস্তব বিকল্প অনুসন্ধান শুরু করেন। আধুনিক ইসলামী ব্যাংকিং সেই দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টার ফল।

১৯৬৩ সালে মিসরের মিত গামর সেভিংস প্রকল্প ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রথম কার্যকর পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দুবাই ইসলামিক ব্যাংক, যা বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইসলামী বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। একই বছরে প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (IsDB) আজ মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান।

বর্তমানে ৮০টিরও বেশি দেশে ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বৈশ্বিক ইসলামী আর্থিক শিল্পের আকার কয়েক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া এবং বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আর্থিক বাস্তবতা।

বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৩ সালে। আজ দেশের ব্যাংকিং খাতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। শিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, রপ্তানি, রেমিট্যান্স এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক খাতে ইসলামী ব্যাংকসমূহ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

তবে সমালোচনাও রয়েছে। সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি উত্থাপিত হয় তা হলো—ইসলামী ব্যাংকের মুনাফার হার এবং প্রচলিত ব্যাংকের সুদের হার কখনো কখনো কাছাকাছি কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর ইসলামী ফিকহের মৌলিক নীতিতেই নিহিত রয়েছে।

হানাফি ফিকহের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম সারাখসী (রহ.) বলেন—

«العبرة في العقود للمقاصد والمعاني لا للألفاظ والمباني

“চুক্তির ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় তার উদ্দেশ্য ও প্রকৃতি; কেবল নাম বা বাহ্যিক কাঠামো নয়।”

(আল-মাবসূত)»

অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বৈধতা নির্ধারিত হবে তার চুক্তিগত কাঠামো, সম্পদের মালিকানা, ঝুঁকি গ্রহণ এবং শরিয়াহসম্মত লেনদেনের ভিত্তিতে; লাভের পরিমাণ বা বাজার পরিস্থিতির ভিত্তিতে নয়।

ইসলামী ব্যাংকিং মূলত মুরাবাহা, মুশারাকা, মুদারাবা, ইজারা, সালাম ও ইস্তিসনার মতো শরিয়াহসম্মত চুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে এর মৌলিক পার্থক্য হলো—প্রচলিত ব্যাংক ঋণের বিপরীতে পূর্বনির্ধারিত সুদ আদায় করে, কিন্তু ইসলামী ব্যাংকিং সম্পদভিত্তিক অর্থায়ন, অংশীদারিত্ব এবং ঝুঁকি ভাগাভাগির নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

এ কথা সত্য যে বর্তমান ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখনও আদর্শ অবস্থায় পৌঁছায়নি। ইসলামী অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন, ইসলামী ব্যাংকগুলোকে আরও বেশি মুশারাকা ও মুদারাবাভিত্তিক বিনিয়োগের দিকে অগ্রসর হতে হবে। শরিয়াহ তদারকি জোরদার করতে হবে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করতে হবে।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—যারা ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সমালোচনা করেন, তারা কি এর চেয়ে অধিক কার্যকর, অধিক শরিয়াহসম্মত এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো বিকল্প আর্থিক মডেল বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন?

এ পর্যন্ত বাস্তবতা হলো, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সমালোচনা অনেক হয়েছে; কিন্তু সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থার কার্যকর ও বৈশ্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য শরিয়াহসম্মত বিকল্প হিসেবে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের চেয়ে উন্নত কোনো পূর্ণাঙ্গ মডেল এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে গঠনমূলক সমালোচনা অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু সমাধানহীন প্রত্যাখ্যানমূলক অবস্থান কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে না।

মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী তাঁর An Introduction to Islamic Finance গ্রন্থে ইসলামী ব্যাংকিংকে আধুনিক যুগে সুদমুক্ত আর্থিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত প্রচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন। ড. মুহাম্মদ উমর চাপরা তাঁর Towards a Just Monetary System গ্রন্থে ইসলামী অর্থব্যবস্থার লক্ষ্য হিসেবে ন্যায়বিচার, অংশীদারিত্ব, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শরিয়াহ মানদণ্ড নির্ধারণ করে AAOIFI (Accounting and Auditing Organization for Islamic Financial Institutions)। একইভাবে IFSB (Islamic Financial Services Board) ইসলামী আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক নীতিমালা প্রণয়ন করে। মুসলিম বিশ্বের শীর্ষ ফিকহ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফিকহ একাডেমি (OIC Fiqh Academy)-ও ইসলামী ব্যাংকিংকে শরিয়াহসম্মত আর্থিক বিকল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

অতএব, ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে, সংস্কারের প্রয়োজনও থাকতে পারে; কিন্তু তথ্য, শরিয়াহ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার আলোকে ইসলামী ব্যাংকিংকে সরলীকৃতভাবে ‘অইসলামী’ আখ্যায়িত করা বাস্তবতার পূর্ণ প্রতিফলন নয়।

বরং বলা যেতে পারে, আধুনিক বিশ্বে সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে ইসলামী ব্যাংকিং এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে সুসংগঠিত, গবেষণানির্ভর, প্রাতিষ্ঠানিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রচেষ্টা। এর উন্নয়ন ও সংস্কারের সুযোগ রয়েছে, কিন্তু সেই সংস্কার হওয়া উচিত জ্ঞান, গবেষণা ও বিকল্প প্রস্তাবনার ভিত্তিতে—কেবল প্রত্যাখ্যানের ভাষায় নয়।

তথ্যসূত্র

১. আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা: ২৭৫–২৭৯।
২. , হাদিস নং ১৫৯৮।
৩. , Shariah Standards।
৪. , Islamic Financial Services Industry Stability Report।
৫. , Quarterly Review on Islamic Banking in Bangladesh।

লেখক
মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন
শিক্ষার্থী, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া



Basic News24