রবিবার, ২৪ Jun ২০১৮, ০২:৫৮ অপরাহ্ন

ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসুন কুয়াকাটায়

ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসুন কুয়াকাটায়

এইচ,এম,হুমায়ুনকবির, কলাপাড়া (পটুয়াখালী) :
সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা ভ্রমণপিপাসু মানুষদের কাছে প্রিয় একটি নাম। “সাগরকন্যা” নামে পরিচিত বাংলাদেশের দক্ষিণের এ সমুদ্র সৈকত অপূর্ব সুন্দরের এক লীলাভূমি। যেখানে দাঁড়িয়ে সুর্যোদয় সুর্যাস্তের অপরুপ দৃশ্য সৈকতের দাঁড়ালে চোখে পড়বে দিগন্ত জোড়া আকাশ আর সমুদ্রর রাশি রাশি নীল জল আর সমুদ্রের নীল জলের তরঙ্গায়িত ঢেউ কাঁচ ভাঙ্গা ঝন ঝন শব্দের মত আছরে পড়ছে কিনারায় ও উড়ে যাচ্ছে সাদা গাংচিলের দল এদিক ওদিক Ñমাছ শিকারের জন্য লড়াকু জেলেরা ট্রলারে ও নৌকায় ছুটে যাচ্ছে গভীর সমুদ্রে তা উপভোগ করা যায়। প্রতি বছর দেশ বিদেশের লাখো পর্যটক ঈদের সময় ভিড় জমান বাংলাদেশের সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় সমুদ্র সৈকত এই কুয়াকাটায়। একই জায়গায় থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখার বিষয়টি নজর কেড়েছে সকল ভ্রমণ পিয়াসীদের। ভোর বেলা সমুদ্রের পেট চিরে সূর্য উদয় হওয়া এবং সন্ধ্যায় সমুদ্রের বক্ষে সূর্যকে লুকিয়ে ফেলার অপরূপ এ সৌন্দর্য উপভোগের জন্য দেশের একমাত্র স্থানতো বটেই- দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও একমাত্র সমুদ্র সৈকত এটি।
ভ্রমণপ্রিয়াসী মানুষদের তীর্থস্থান এ কুয়াকাটায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত অবলোকন ছাড়াও রয়েছে বেড়ানোর মতো আরও নানান আকর্ষণ।
কুয়াকাটার কুয়া :
কুয়াকাটা নামকরণের ইতিহাসের পেছনে যে কুয়া সেটি এখনও টিকে আছে। মাতৃভূমি দখলের পর রাখাইনরা এখানে বসতি স্থাপন করে এবং সাগরের লোনা জল ব্যবহারের অনুপযোগী বলে মিষ্টি পানির জন্য একটি কূপ খনন করে। এরপর থেকে জায়গাটি কুয়াকাটা নামে-পরিচিতি-পায়।
রাখাইন পল্লী :
কুয়াকাটা সৈকতের মনোরম দৃশ্য উপভোগের সাথে আদিবাসী রাখাইনদের স্থাপথ্য নিদর্শন পর্যটকমহলের জন্য বাড়তি আকর্ষন। প্রায় দুইশত বছর পূর্বে আরাকান রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে আসা রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের রাজা মং এর নেতৃত্বে সাগর পাড়ি দিয়ে প্রথমে চট্রগ্রাম এবং পরে পটুয়াখালীর এ জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায় তাদের বসতি স্থাপন করে। নিজস্ব ঐতিহ্য ও কৃষ্টে গড়ে তোলে নিজেদের আবাসস্থল।
সমুদ্র সৈকত :
কুয়াকাটার সৈকত প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। সৈকত লাগোয়া পুরো জায়গাতেই আছে দীর্ঘ নারিকেল গাছের সারি। যদিও ভাঙনের কবলে পড়ে বর্তমানে প্রায় নিশ্চিহ্ন কুয়াকাটার নারিকেল বাগানের অপরূপ সৌন্দর্য। এ সৈকতে সারা বছরই দেখা মিলবে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য। সৈকতের পূর্ব প্রান্তে গঙ্গামতির বাঁক থেকে সূর্যোদয় সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা যায়। আর সূর্যাস্ত দেখার উত্তম জায়গা হল কুয়াকাটার পশ্চিম সৈকত।
চর বিজয় :
কুয়াকাটা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার বঙ্গোপসাগর অভ্যন্তরে সাগরের অথৈই পানির মাঝে লক্ষ লক্ষ পাখির কলরব আর লাল কাকড়ার বিচরনে সমৃদ্ধ এ চর। অগনিত অতিথি পাখি আর লাল কাঁকড়ার অবাধ বিচরণে তৈরি হওয়া নান্দনিক সৌন্দর্য আকৃষ্ট করবে দেশি-বিদেশি পর্যটকের।
শুঁটকি পল্লী :
পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম প্রান্তে থাকা জেলে পল্লী। নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত যেখানে চলে মূলত শুঁটকি তৈরির কাজ। সমুদ্র থেকে মাছ ধরে এনে সৈকতেই শুঁটকি তৈরি করেন জেলেরা।
লাল কাঁকড়ার চর :
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পূবদিকে গঙ্গামতির জঙ্গল ছাড়িয়ে আরও সামনে গেলে চোখে পড়বে ক্রাব আইল্যান্ড বা কাঁকড়ার দ্বীপ। এ জায়গায় আছে লাল কাঁকড়ার বসবাস। নির্জনতা পেলে এ জায়গার সৈকত লাল করে বেড়ায় কাঁকড়ার দল। ভ্রমণ মৌসুমে (অক্টোবর-মার্চ) কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে স্পিড বোটে যাওয়া যায় লাল কাকড়ার চরে।
ইলিশ পার্ক :
কুয়াকাটায় পর্যটকদের বিনোদনে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে ইলিশ পার্ক। এখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কৃত্রিম ইলিশের পেটের মধ্যের রেস্তোরায় বসে ইলিশ খেতে পারবে দর্শনার্থী ও পর্যটকরা।
রয়েছে ভোঁদর, বানর, বেজি, পাহাড়ি গুঁই সাপ, বিদেশী কুকুরসহ কৃত্রিম বাঘ, সিংহ, হরিণ, কুমির, বক, কচ্ছপ, জিরাফ সহ নানা প্রজাতির জীবজন্তুর ভাস্কর্য।
ইকোপার্ক ও জাতীয় উদ্যান :
সমুদ্র সৈকতের কোল ঘেঁষে প্রায় ২০০ একর জায়গায় ষাটের দশকে পরিকল্পিত ভাবে গড়ে উঠা নারিকেল কুঞ্জ, ঝাউবন, গঙ্গামতি সংরক্ষিত বন , পশ্চিমদিকের ফাতরার বন ও মহিপুরের রেঞ্জের বনাঞ্চল নিয়ে গড়ে উঠেছে ইকোপার্ক ও জাতীয় উদ্যান ।
সমুদ্র সৈকতে দাঁিড়য়ে ঝাউবাগানের দিকে দৃষ্টি বেরসিক দর্শকের কাছে ও অমলিন এক স্বর্গীয় আবেদন সৃষ্টি করে ।
চরগঙ্গামতির জঙ্গল :
কুয়াকাটার মূল ভূখন্ডের পূর্বদিকে ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পর্যটক আকর্ষনের লোভনীয় একটি স্থান চর গঙ্গামতি। এখানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করার পাশাপাশি কেওড়া , গেওয়া , ছৈলা ইত্যাদি হরেক রকমের গাছগাছালি ছাড়াও বুনোশুয়োর , বন মোরগ , আর বানরের কিচির মিচির শব্দ যে কাউকে মোহিত করবে।
মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ মন্দির :
কুয়াকাটা সৈকত থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী সম্প্রদায় রাখাইনদের একটি গ্রামের নাম মিশ্রিপাড়া। এখানে আছে বড় একটি বৌদ্ধ মন্দির। কথিত আছে এ মন্দিরের ভেতরে আছে এশিয়া উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় বুদ্ধ মূর্তি। এছাড়া এখান থেকে সামান্য দূরে আমখোলা গ্রামে আছে এ অঞ্চলে রাখাইনদের সবচেয়ে বড় বসতি।
ফাতরার বন :
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম পাশে নদী পার হলেই সুন্দরবনের শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল, নাম তার ফাতরার বন। সুন্দরবনের সব বৈশিষ্ট এ বনে থাকলেও নেই তেমন কোন হিংস্র প্রাণী। বন মোরগ, বানর আর নানান পাখি আছে এ বনে। কদাচিৎ এ বনে বুনো শুকরের দেখা মেলে। কুয়াকাটা থেকে ফাতরার বনে যেতে হবে ইঞ্জিন নৌকায়।
সোনাকাটা ইকোপার্ক :
সোনাকাটা ইকোপার্কে সোনা নেই ঠিকই, কিন্তু আছে সোনার রঙে রাঙিত বালি। সুর্যের রশ্মি যখন বালির ওপর পড়ে তখন দূর থেকে মনে হয়, সত্যি সত্যিই সোনার আবির্ভাব হয়েছে এখানে। মৃদু মৃদু বাতাস আর ঢেউয়ের তালে এই চরের ছোট-ছোট বাঁওড়ে অথবা খালে চলে জেলেদের নৌকাগুলোর দৃশ্য মন কাড়বে সকলের। এখানে সহজেই চোখ পড়বে হরিণ, শুকর, বানর, মেছো বাঘসহ আরও সব বন্য প্রাণীর ওপর। পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা থেকে এসব স্থানে ট্রলারে যাতায়াতের সুযোগ রয়েছে।
সীমা বৌদ্ধ মন্দির :
কুয়াকাটার প্রাচীন কুয়ার সামনেই সীমা বৌদ্ধ মন্দির। কাঠের তৈরি এই মন্দির কয়েক বছর আগে ভেঙে দালান তৈরি করা হয়েছে। তবে মন্দিরের মধ্যে এখনও আছে প্রায় ৩৭ মন ওজনের প্রাচীন অষ্টধাতুর তৈরি বুদ্ধ মূর্তি।
ঢাকা থেকে যেভাবে যাবেন :
ঢাকা থেকে কুয়াকাটা দুই পথে যেতে পারেন। একটি নৌপথ আরেকটি সড়ক পথ। নৌপথে যেতে হলে প্রথমেই আপনাকে যেতে হবে ঢাকা সদর ঘাট। সেখান থেকে প্রতিদিন বরিশাল ও পটুয়াখালীর উদ্দেশে যাত্রা করে কয়েকটি অত্যাধুনিক লঞ্চ। এরপর এখান থেকে বাসযোগে কুয়াকাটা যেতে হবে। সড়ক পথে যেতে হলে আপনাকে যেতে হবে সায়েদাবাদ বা গাবতলী বাস স্ট্যান্ড। ডে এবং নাইট কোচের এসি, নন-এসি দুই ধরনের বাস সার্ভিসই পাবেন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




  • ডিজাইনঃবেসিক নিউস২৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com